বাংলা পাঠকের কাছে একটি অদ্ভুত দ্বৈত অভিজ্ঞতা আছে যা পৃথিবীর খুব কম গোয়েন্দা চরিত্রের পাঠকের কপালে জুটেছে। প্রদোষচন্দ্র মিত্রকে তাঁরা প্রথমে চেনেন দেশ পত্রিকার পাতায়, তারপর সন্দেশের পাতায়, তারপর আনন্দ পাবলিশার্সের সাদা মলাটের সংকলনে; এবং তাঁরা একই চরিত্রকে আবার চেনেন রুপোলি পর্দায়, যেখানে তাঁকে গড়ে তুলেছেন স্বয়ং তাঁর স্রষ্টা। সত্যজিৎ রায় তাঁর নিজের গোয়েন্দা চরিত্রকে দু-বার চলচ্চিত্রে রূপ দিয়েছেন, এবং এই দ্বৈত-জনকত্বের কারণে ফেলুদার চলচ্চিত্রায়ন সম্পর্কে যে কোনও বিশ্লেষণ অন্য যে কোনও সাহিত্য-চলচ্চিত্র সম্পর্কের চেয়ে আলাদা ভিত্তিতে শুরু করতে হয়। এখানে অনুবাদক ও মূল-লেখক একই মানুষ, এবং সেই মানুষটি আবার বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র-শিল্পী। এই প্রবন্ধে আমরা দেখব ফেলুদার চলচ্চিত্রায়ন রায়ের গদ্যের ঠিক কী ধরে রাখতে পেরেছে, কী রূপান্তরিত করেছে, এবং কী অনিবার্যভাবে পর্দার বাইরে থেকে গেছে। আলোচনার পরিধির ভেতর থাকবে রায়ের নিজের দু’টি ছবি, সন্দীপ রায়ের ধারাবাহিকতা, সব্যসাচী চক্রবর্তীর দীর্ঘ ইনিংস, এবং নতুন প্রজন্মের পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

রায়ের নিজের ক্যামেরা: সোনার কেল্লার ভূমিকা
সোনার কেল্লা যখন প্রথম পর্দায় আসে, তখন বাংলা পাঠক একটি বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিল। তাঁরা ইতিমধ্যেই উপন্যাসটি পড়ে ফেলেছেন, রাজস্থানের রঙ-রেখাচিত্র মনে গেঁথে নিয়েছেন, ফেলুদার গলার স্বর কল্পনায় শুনে নিয়েছেন। এবং তারপর সেই একই গল্প রায়ের নিজের ক্যামেরায়, রায়ের নিজের সংগীতে, রায়ের নিজের বাছাই-করা অভিনেতাদের শরীরে এসে দাঁড়াল। এই মুহূর্তটি বাংলা সংস্কৃতির ভেতরে এমন একটি ঘটনা যার তুলনা পাওয়া মুশকিল। যেন একই গল্পকার দু’বার একই কাহিনি বললেন, কিন্তু দ্বিতীয় বার তিনি ছবি আঁকার তুলি বদলে নিলেন।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ফেলুদা সম্পর্কে বহু আলোচনা হয়েছে, কিন্তু একটি কথা বার বার বলা দরকার। সৌমিত্র যা করেছেন তা হল গদ্যের একটি বিশেষ ছন্দকে শরীরের ছন্দে রূপান্তর। উপন্যাসে ফেলুদা যখন ভাবেন, তখন রায় তোপসের কণ্ঠে সেই ভাবনার বাইরের ঢেউটুকু তুলে ধরেন; পাঠক বুঝতে পারেন যে ভেতরে কিছু একটা ঘটছে, কিন্তু সেই ভেতরের চিত্রটি পাঠকের কল্পনায় তৈরি হতে দেওয়া হয়। সৌমিত্রের অভিনয়ে এই ‘ভেতর-বাহিরের ফাঁক’ টিকে থাকে। তিনি কখনও মুখের পেশিতে অতিরিক্ত কিছু করেন না, চোখের ভাষাতেও না; তিনি একটি স্থিরতা ধরে রাখেন যা পর্দার সামনের দর্শককে নিজের মতো করে ভাবতে দেয় - এই মানুষটির মাথায় এখন কী ঘটছে। এই ‘দর্শককে কাজ করতে দেওয়া’র অভিনয়রীতি রায়ের গদ্যের সঙ্গে স্বাভাবিক ছন্দে মিলে যায়।
আন্দ্রে রবিনসন তাঁর ‘সত্যজিৎ রায়: দ্য ইনার আই’ গ্রন্থে সোনার কেল্লা প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রেখেছেন। তিনি বলছেন, রায় এই ছবিতে নিজেকে এমন একটি সংযম রক্ষা করতে বাধ্য করেছিলেন যা তাঁর পূর্ববর্তী ছবিগুলিতে দেখা যায়নি। কারণ ছবিটি ছোটদেরও দেখার কথা, এবং একই সঙ্গে বড়দেরও বঞ্চিত করার কথা নয়। এই দ্বৈত-দর্শকের জন্য কাজ করার ছন্দটি রায়ের গদ্যেও আছে, কিন্তু গদ্যে সেই ছন্দ তৈরি করা সহজতর। ছবিতে সেটি তৈরি করতে হলে ফ্রেমের ভেতর প্রতিটি উপাদান, প্রতিটি কাট, প্রতিটি সংলাপ-বিরতি গুনে নিতে হয়। সোনার কেল্লার সাফল্য এখানেই - এটি একই সঙ্গে একটি অ্যাডভেঞ্চার ছবি এবং একটি ধ্যানময় ছবি, একই সঙ্গে গতিময় এবং শান্ত।
তবে এমন কিছু বিষয় আছে যা পর্দায় এনে দেওয়া প্রায় অসম্ভব। উপন্যাসে রাজস্থানের বর্ণনায় রায় যে গদ্যছন্দ ব্যবহার করেন, সেখানে দূরত্ব ও বিস্ময়ের একটি মিশ্রণ থাকে। তোপসে যখন প্রথম মরুভূমি দেখে, তখন তার বয়ান-ভাষায় বিস্ময় এবং একটি বাঙালি কিশোরের চোখে নতুন ভূগোলের অপরিচয় - এই দু’টি স্তর একই সঙ্গে কাজ করে। ছবিতে আমরা মরুভূমি দেখি, খুব সুন্দরভাবে দেখি, কিন্তু সেই দেখাটি ‘বাঙালি কিশোরের চোখে দেখা’ হয়ে ওঠে না; সেটি ‘সকলের চোখে দেখা’ হয়ে যায়। ভাষার ভেতরের সাংস্কৃতিক-ব্যক্তিগত স্তরটি ছবি স্বাভাবিকভাবেই সমতল করে দেয়।
জয় বাবা ফেলুনাথ এবং রায়ের দ্বিতীয় ভ্রমণ
জয় বাবা ফেলুনাথ যখন তৈরি হয়, তখন রায় ইতিমধ্যেই ফেলুদাকে পর্দায় কেমন দেখায় তা জেনে গেছেন। সোনার কেল্লার অভিজ্ঞতা তাঁর সঙ্গে আছে, সৌমিত্র-সন্তোষ-সিদ্ধার্থ ত্রয়ী আছে, এবং বেনারসের ভৌগোলিক চরিত্র তাঁর কাছে চেনা। এই ছবিতে রায় একটি ভিন্ন কাজ করার চেষ্টা করেন। সোনার কেল্লা যেখানে অ্যাডভেঞ্চারের দিকে ঝুঁকেছিল, জয় বাবা ফেলুনাথ সেখানে অপরাধ-নাটকের দিকে। এখানে মগনলাল মেঘরাজ আছে, যাকে উৎপল দত্ত এমন এক চেহারা দেন যা সাহিত্যের পাতার মগনলালকে চিরকালের জন্য গ্রাস করে নিয়েছে।
মগনলালের চরিত্রায়ন একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত যেখানে ছবি সাহিত্যের চেয়ে এগিয়ে যায়। উপন্যাসে মগনলাল একটি ভয়ঙ্কর কিন্তু কিছুটা একতলীয় খলনায়ক; তাঁর হিন্দি-মেশানো বাংলা, তাঁর হিংস্র শখ, তাঁর ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশ - সব মিলিয়ে একটি কার্যকর কিন্তু পরিচিত ধাঁচের গুন্ডা-চরিত্র। উৎপল দত্ত এই চরিত্রটিকে যা দেন তা হল একটি অভিনয়-গভীরতা যা গদ্যের বাইরে। তাঁর হাসি, তাঁর শরীরের ভাষা, তাঁর গলার সেই শ্লেষাত্মক ভঙ্গি, তাঁর চোখের ঠান্ডা উপস্থিতি - এই সব মিলিয়ে মগনলাল হয়ে ওঠেন বাংলা গোয়েন্দা-ছবির ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় খলনায়ক। এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে অভিনেতা ও পরিচালক মিলে লেখকের চরিত্রকে আরও সমৃদ্ধ করেন।
কিন্তু একই ছবিতে আমরা একটি ভিন্ন ধরনের সমস্যাও দেখি। উপন্যাসে রুকু-সম্পর্কিত যে অংশটুকু আছে, যেখানে শিশুটি ম্যাজিক দেখে মুগ্ধ হয়, যেখানে মাছিভানু ভিন্ন ভিন্ন স্তরে গল্পটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে - সেই অংশের ভেতরের যে আবেগময় ছন্দ, তা পর্দায় কিছুটা সংকুচিত হয়ে যায়। ছবির সময়সীমার ভেতরে সব কিছু এনে দেওয়ার যে চাপ, সেই চাপে চরিত্রগুলির ‘অপ্রয়োজনীয়’ মুহূর্তগুলি কেটে ফেলতে হয়; কিন্তু রায়ের গদ্যে এই ‘অপ্রয়োজনীয়’ মুহূর্তগুলিই অনেক সময় চরিত্রকে বাঁচিয়ে রাখে। জেরোম ব্রুনার তাঁর ‘অ্যাকচুয়াল মাইন্ডস, পসিবল ওয়ার্ল্ডস’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে কাহিনিতে চরিত্রের ‘স্বতঃসিদ্ধতা’ তৈরি হয় তথাকথিত গৌণ মুহূর্তগুলির ভেতর দিয়ে - সেই দৃশ্যগুলি যেখানে কিছু ‘ঘটে’ না, কেবল চরিত্ররা থাকে। ছবি সেই মুহূর্তগুলির জন্য সাধারণত সময় বরাদ্দ করতে পারে না।
বেনারসের চরিত্রায়ন এই ছবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। স্বাতী চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘রিপ্রেজেন্টিং ক্যালকাটা’ গ্রন্থে যেভাবে দেখিয়েছেন একটি শহরকে পর্দায় তোলার মানে শুধু তার রূপ নয়, তার আত্মাকেও আনার চেষ্টা, রায় ঠিক সেই কাজটি বেনারসের সঙ্গে করেন। গঙ্গার ঘাট, সরু গলি, সাধুদের অস্থায়ী আশ্রয়, কুস্তির আখড়া - এই সবকিছু মিলিয়ে বেনারস এখানে নিছক পটভূমি নয়, একটি চরিত্র। এই কাজে ছবি গদ্যের চেয়ে এগিয়ে যায়, কারণ গদ্যে স্থানের বর্ণনা যত বিস্তৃতই হোক, সেটি পাঠকের কল্পনার মধ্য দিয়ে এক ধরনের ছাঁকনি পার হয়ে আসে। ক্যামেরা যা দেখায়, সেটি সরাসরি দর্শকের চোখে পৌঁছয়।
সন্দীপ রায়ের উত্তরাধিকার এবং তার চাপ
পিতার মৃত্যুর পরে সন্দীপ রায় যে কাজটি গ্রহণ করেন, তা সহজ ছিল না। তাঁর বাবার তৈরি দু’টি ছবি ইতিমধ্যেই বাংলা চলচ্চিত্র-ঐতিহ্যের ভেতর গেঁথে গেছে; এবং তাঁর বাবা স্বয়ং সেই গদ্যের লেখক। সন্দীপ রায়কে এই দ্বিগুণ ভার নিয়ে কাজ শুরু করতে হয়েছিল। বাক্সো রহস্য যখন তিনি প্রথমে টেলিফিল্ম হিসেবে এবং পরে চলচ্চিত্র হিসেবে তৈরি করেন, তখন তাঁর কাজের ভেতর একটি পরিচিত-করানোর চেষ্টা ছিল। তিনি সব্যসাচী চক্রবর্তীকে এমন এক ফেলুদা হিসেবে দাঁড় করালেন যিনি সৌমিত্রের ছায়ায় থেকেও আলাদা একটি অস্তিত্ব তৈরি করতে পারেন।
বম্বাইয়ের বম্বেটে, কৈলাসে কেলেঙ্কারি, টিনটোরেটোর যিশু, গোরস্থানে সাবধান - এই ধারাবাহিক ছবিগুলির ভেতর দিয়ে সন্দীপ রায় একটি স্থিতিশীল কাজের ছন্দ তৈরি করেন। প্রতিটি ছবি প্রায় একই গাঠনিক কাঠামো অনুসরণ করে: একটি রহস্যের প্রস্তাবনা, ভ্রমণ, অনুসন্ধান, খলনায়কের সঙ্গে মুখোমুখি, এবং সমাধান। এই পুনরাবৃত্তি একদিকে যেমন দর্শককে স্বস্তি দেয় - তাঁরা জানেন কী আশা করতে হবে - তেমনই অন্যদিকে এটি সিরিজটিকে একটি সুরক্ষিত ছকের ভেতর আবদ্ধ করে রাখে।
জেসন মিটেল তাঁর ‘কমপ্লেক্স টিভি’ গ্রন্থে যে কথাটি ধারাবাহিক টেলিভিশন-আখ্যানের প্রসঙ্গে বলেছেন, তা সন্দীপ রায়ের ফেলুদা-ছবি সম্পর্কেও প্রযোজ্য। তিনি দেখাচ্ছেন যে যে কোনও ধারাবাহিক চরিত্র-ভিত্তিক প্রকল্পের সামনে দু’টি পথ থাকে: চরিত্রকে ক্রমশ গভীরে নিয়ে যাওয়া, অথবা প্রতিটি পর্বকে স্বনির্ভর হিসেবে রাখা। সন্দীপ রায় দ্বিতীয় পথটি নেন। তাঁর ছবিগুলির ভেতর সব্যসাচীর ফেলুদা প্রায় একই থাকেন, পরিবর্তিত হন না; তোপসে বড় হন না; জটায়ু একই কৌতুকের ছন্দে বার বার ফিরে আসেন। এই পদ্ধতির সুবিধা হল এক ধরনের নিরাপদ পরিচিতি; অসুবিধা হল চরিত্রের ভেতরের সম্ভাব্য বিকাশ অনাবিষ্কৃত থেকে যায়।
সন্দীপ রায়ের ছবিগুলি আরেকটি অনিবার্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় যা পিতার কাজে ছিল না। তাঁর ছবিগুলি টেলিভিশনের জন্য, ডিভিডির জন্য, আজকের ওটিটি-পরিবেশের জন্য তৈরি; এবং এই মাধ্যম-পরিবেশ তাঁর কাজের ছন্দ ও পরিসরকে গঠন করে। তাঁকে এমন একটি দর্শকের কথা ভাবতে হয় যাঁরা ছবি দেখার সময় মাঝে মাঝে অন্য কাজও করেন, যাঁরা মোবাইল ফোনে নোটিফিকেশন আসে বলে কয়েক মিনিটের জন্য মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন। এই বাস্তবতা সংলাপকে অপেক্ষাকৃত স্পষ্ট করে তোলে, ঘটনার ব্যাখ্যাকে অপেক্ষাকৃত সরাসরি করে তোলে। পিতার ছবিতে যে নৈঃশব্দ্যের পরিসর ছিল, সন্দীপ রায়ের ছবিতে সেটি একটু কম। কিন্তু সেই পরিবর্তনকে দুর্বলতা বলা ভুল হবে; এটি ভিন্ন মাধ্যম-পরিস্থিতির প্রতি একটি যুক্তিসঙ্গত অভিযোজন।
সব্যসাচী চক্রবর্তী এবং একটি দীর্ঘ ইনিংসের অভিনয়-সমস্যা
সব্যসাচী চক্রবর্তী এতদিন ধরে ফেলুদার ভূমিকায় কাজ করেছেন যে আজকের নতুন প্রজন্মের অনেক বাঙালি দর্শকের কাছে তিনিই ফেলুদা। সৌমিত্রের ছায়া তাঁদের পেছনে আছে, কিন্তু সামনে যে মুখটি, যে দীর্ঘ চেহারাটি, যে গলার গভীর স্বর - সেটি সব্যসাচীর। এই দীর্ঘ ইনিংসের অভিনয়-সমস্যা সম্পর্কে বিশেষ আলোচনা প্রয়োজন।
সব্যসাচীর কাজের একটি বড় শক্তি হল তিনি বাংলা ভদ্রলোক-চরিত্রের যে শারীরিক-কণ্ঠী ভঙ্গি, সেটিকে স্বাভাবিকভাবে ধারণ করতে পারেন। তাঁর হাঁটার ভঙ্গি, তাঁর কথা বলার সময়ের বিরতি, তাঁর হাসির ধরন - সব মিলিয়ে এক ধরনের চেনা-শোনা বাঙালি বুদ্ধিজীবীর ছবি তৈরি হয়। তিথি ভট্টাচার্য তাঁর ‘দ্য সেন্টিনেলস অফ কালচার’ গ্রন্থে বাংলা ভদ্রলোক শ্রেণির যে সাংস্কৃতিক-শারীরিক স্বভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন, সব্যসাচীর অভিনয়ে সেই স্বভাবের একটি বিশ্বাসযোগ্য রূপ আছে। এটি এমন এক অভিনয় যা অভিনয়-প্রকাশকে সংযম দিয়ে ঢেকে রাখে।
কিন্তু দীর্ঘ ইনিংসের সমস্যা হল ফেলুদা চরিত্রটি তরুণ। উপন্যাসে তাঁর বয়স তিরিশের কোঠায়, তোপসের প্রায় দ্বিগুণ। সব্যসাচী যখন সিরিজটি শুরু করেন, তখন তিনিও তুলনামূলকভাবে তরুণ। কিন্তু ছবিগুলি যত এগোতে থাকে, তিনি বয়স্ক হতে থাকেন; এবং চরিত্রটি বয়স্ক হয় না। এই ফাঁকটি সিরিজের পরবর্তী ছবিগুলিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফেলুদার শারীরিক চটপটাইটি যেখানে গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, সেখানে অভিনেতার বয়সের সঙ্গে চরিত্রের বয়সের অমিল কাজ করতে শুরু করে। এটি কোনও দুর্বলতা নয়, এটি বাস্তবতা; দীর্ঘকাল একই চরিত্র করা যে কোনও অভিনেতার সামনে এই সমস্যা আসে।
বিভু ভট্টাচার্যের জটায়ু এখানে সব্যসাচীর কাজের সঙ্গে এক চমৎকার রসায়ন তৈরি করেছিল। জটায়ুর কৌতুক একটি কঠিন কাজ - এটি যদি বেশি হয়ে যায়, চরিত্রটি কার্টুন হয়ে যায়; যদি কম হয়, তবে কৌতুকের ভিত্তিই থাকে না। বিভু ভট্টাচার্য একটি মাঝামাঝি অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছিলেন। তাঁর পরে যাঁরা এই চরিত্র করেছেন তাঁদেরও নিজস্ব দক্ষতা আছে, কিন্তু সব্যসাচী-বিভু রসায়ন একটি বিশেষ মুহূর্ত ধরে রেখেছিল।
টোটা রায়চৌধুরী, ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত এবং নতুন প্রজন্মের পরীক্ষা
বিগত কয়েক বছরে ফেলুদাকে নিয়ে নতুন কাজ হয়েছে - সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায়, টোটা রায়চৌধুরীর অভিনয়ে; ধ্রুব ব্যানার্জির নির্দেশনায়, আবীর চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ে; এবং অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। এই নতুন ঢেউটি সম্পর্কে কিছু আলোচনা প্রয়োজন কারণ এটি আমাদের দেখায় যে রায়ের লেখা চরিত্রটি এখনও কতটা নমনীয়, কতটা পুনর্ব্যাখ্যার যোগ্য।
টোটা রায়চৌধুরীর ফেলুদা একটি ভিন্ন শারীরিক উপস্থিতি নিয়ে আসেন। তিনি অপেক্ষাকৃত পেশীবহুল, অপেক্ষাকৃত শারীরিকভাবে সক্রিয়; তাঁর ফেলুদা যেন আরও আগের যুগের, যেখানে গোয়েন্দার শরীরী সক্ষমতা গল্পের ভেতর একটি দৃশ্যমান উপাদান। সৃজিত মুখোপাধ্যায় এই শারীরিকতাকে কাজে লাগান অ্যাকশন-দৃশ্যে, যেখানে ক্যামেরা গতি ও কাটের মাধ্যমে এক ধরনের আধুনিক চলচ্চিত্র-ব্যাকরণ তৈরি করে।
এই পরিবর্তনটির মূল্য আছে এবং সমস্যাও আছে। মূল্যটি হল রায়ের লেখা চরিত্রটিকে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখার সুযোগ। পুরনো ছবিগুলির ছন্দ এমন একটি ধীর, ধ্যানময়, প্রায়-সাহিত্যিক ছন্দে চলত। নতুন ছবিতে সেই ছন্দ বদলে যায়; ছবি দ্রুতগামী হয়ে ওঠে, কাটগুলি ছোট হয়ে আসে, সংগীত আরও দাপটে আসে। এই পরিবর্তনটি একটি নতুন প্রজন্মের দর্শকের অভ্যাসের সঙ্গে মানানসই। যাঁরা মার্ভেলের ছবি দেখে বড় হয়েছেন, যাঁরা ওটিটি-প্ল্যাটফর্মে দ্রুত-গতির গোয়েন্দা-ধারাবাহিক দেখেন, তাঁদের কাছে এই নতুন ছন্দটি স্বাভাবিক।
সমস্যাটি হল রায়ের গদ্যে যে সংযম, যে নৈঃশব্দ্যের পরিসর, যে ‘কম দিয়ে বেশি বলা’র অভ্যাস - সেটি এই দ্রুত ছন্দে কিছুটা চাপা পড়ে যায়। ফেলুদা যে শুধুই একজন অ্যাকশন-গোয়েন্দা নন, তিনি একজন ভাবুক-গোয়েন্দাও, এই দিকটি দ্রুত-গতির ছবিতে প্রকাশ পেতে অসুবিধা হয়। চিন্তা-ভাবনার দৃশ্যকে পর্দায় তোলা সবসময়ই কঠিন; দ্রুত-গতির ছবিতে সেটি প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। কারণ চিন্তার জন্য চাই দীর্ঘ শট, চাই নিস্তব্ধতা, চাই অভিনেতার মুখের ওপর ক্যামেরার ধৈর্য।
আবীর চট্টোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ-অভিনয়ের অভিজ্ঞতা তাঁর ফেলুদা-চরিত্রায়নে একটি বিশেষ মাত্রা যোগ করে। তিনি ভিন্ন একটি বাঙালি গোয়েন্দা-ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে এসেছেন, এবং তাঁর কাজে দু’টি ঐতিহ্যের সংলাপ অনুভব করা যায়। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশের সঙ্গে রায়ের ফেলুদার পার্থক্যটি একটি চমৎকার তুলনামূলক বিষয়, এবং আবীরের অভিনয়ে সেই পার্থক্যটি যেন শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকে।
কী রূপান্তরিত হয়, কী হারিয়ে যায়
এই বিভাগে আমরা কিছুটা পদ্ধতিগতভাবে দেখার চেষ্টা করি ফেলুদার চলচ্চিত্রায়ন সাহিত্য থেকে কী নিতে পারে এবং কী রেখে আসতে বাধ্য হয়।
চলচ্চিত্র যা ভালোভাবে নিতে পারে তার ভেতর প্রথমেই আসে স্থানের চরিত্র। রাজস্থানের মরুভূমি, বেনারসের ঘাট, কাঠমাণ্ডুর পাহাড়, লখনউয়ের নবাবি স্থাপত্য, হংকংয়ের শহুরে ঘনত্ব - এই সব স্থান ছবিতে এমন এক প্রত্যক্ষতা পায় যা গদ্যে পাওয়া কঠিন। গদ্য পাঠকের কল্পনায় স্থান তৈরি করে; ছবি সেই স্থানকে সরাসরি চোখের সামনে আনে। এই সরাসরিত্বের মূল্য আছে, বিশেষত যখন গল্পের ভেতর স্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের ভূমিকা নেয়।
দ্বিতীয়ত, ছবি নিতে পারে চরিত্রের শারীরিক উপস্থিতি। মগনলাল মেঘরাজের গলার ঠান্ডা ভঙ্গি, ফেলুদার দীর্ঘ শরীরের সংযম, জটায়ুর কৌতুকের ভঙ্গি - এই সব শারীরিক উপাদান গদ্যে শব্দে বর্ণনা করতে হয়, কিন্তু ছবিতে সেগুলি সরাসরি দেখা যায়। ভালো অভিনেতা পেলে চরিত্র এমন এক জীবন্ততা পায় যা গদ্যকে অতিক্রম করে যায়।
তৃতীয়ত, ছবি নিতে পারে সংগীতের মাত্রা। সত্যজিৎ রায়ের নিজের সংগীত সোনার কেল্লা ও জয় বাবা ফেলুনাথে যেভাবে কাজ করে, সেটি গদ্যে পাওয়া অসম্ভব। সংগীত আবহ তৈরি করে, উত্তেজনা গড়ে, বিরতি দেয়, আবার গতি আনে। এই মাত্রাটি চলচ্চিত্রের একান্ত নিজস্ব সম্পদ।
ছবি যা হারিয়ে ফেলে তার ভেতর প্রথমেই আসে তোপসের বয়ান-ভঙ্গি। উপন্যাসগুলি প্রায় সব কয়টিই তোপসের প্রথম-পুরুষ জবানিতে লেখা। এই জবানি একদিকে কিশোর-পাঠকের জন্য একটি প্রবেশদ্বার, অন্যদিকে এটি ফেলুদার চরিত্রকে একটি বিশেষ দূরত্ব থেকে দেখা সম্ভব করে। তোপসে যখন ফেলুদাকে প্রশ্ন করে, যখন তার কথায় বিস্ময় বা সংশয় বা ভক্তি প্রকাশ পায়, তখন পাঠক সেই বিস্ময়-সংশয়-ভক্তির মধ্য দিয়ে ফেলুদাকে চেনে। ছবিতে এই বয়ানভঙ্গিটি পুরোপুরি ধরে রাখা যায় না। কেউ কেউ ভয়েসওভার ব্যবহার করেছেন, কিন্তু ভয়েসওভার ছবিকে আনাড়ি করে তুলতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ছবি প্রায়ই হারিয়ে ফেলে গদ্যের ভেতরের বিরতি। রায়ের গদ্যে এমন কিছু মুহূর্ত আছে যেখানে কিছু ‘ঘটে’ না, কেবল চরিত্ররা থাকে - হোটেলের ঘরে চা খেতে খেতে গল্প করে, ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়, রাতে তারা দেখে। এই মুহূর্তগুলি সাহিত্যিক রচনায় চরিত্রের ‘বাসযোগ্যতা’ তৈরি করে - পাঠক চরিত্রগুলির সঙ্গে এক ধরনের ঘরোয়া সঙ্গ তৈরি করে। ছবিতে এই মুহূর্তগুলির জন্য সাধারণত সময় বরাদ্দ থাকে না; এবং থাকলেও, পরিচালকেরা প্রায়ই সেগুলি ছেঁটে ফেলেন কারণ সেগুলি ‘কিছু এগোয় না’।
তৃতীয়ত, ছবি হারিয়ে ফেলে গদ্যের ভেতরের ভাষা-খেলা। রায়ের গদ্যে শব্দ-নির্বাচন, বাক্য-গঠন, ছন্দ-পরিবর্তন - এই সব এক ধরনের পাঠ-আনন্দ তৈরি করে যা ছবিতে অনুবাদ করা যায় না। ফেলুদা যখন একটি বিশেষ বাংলা শব্দ ব্যবহার করেন, যখন তিনি তোপসেকে একটি সংস্কৃত শ্লোকের অর্থ বুঝিয়ে দেন, যখন তিনি জটায়ুর কোনও ভুল উচ্চারণ সংশোধন করেন - এই সব মুহূর্তে বাংলা ভাষার একটি বিশেষ আনন্দ আছে যা ছবিতে আসা মুশকিল।
চতুর্থত, ছবি হারিয়ে ফেলতে পারে চরিত্রের ভেতরের চিন্তা-প্রবাহ। ফেলুদা যখন একটি রহস্যের সমাধান করেন, তখন উপন্যাসে আমরা তাঁর চিন্তার পদ্ধতিটি কিছুটা দেখতে পাই - কোন সূত্রকে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন, কোনটিকে বাদ দিচ্ছেন, কেন। কার্লো গিনজবুর্গ তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘মোরেল্লি, ফ্রয়েড অ্যান্ড শারলক হোমস’-এ গোয়েন্দার চিন্তা-পদ্ধতিকে যেভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, সেই বিশ্লেষণটি গদ্যে যত স্বাভাবিকভাবে দেখানো যায়, ছবিতে তা পারা যায় না। ছবিতে গোয়েন্দার চিন্তাকে দেখাতে হলে সংলাপ ব্যবহার করতে হয়, যা প্রায়ই কৃত্রিম শোনায়।
রায়ের গদ্যের ছন্দ এবং ক্যামেরার ছন্দ
দু’টি ছন্দের তুলনা আমাদের দেখায় কেন কিছু কিছু ছবি অন্য কিছু ছবির চেয়ে ভালোভাবে মূল রচনার আত্মা ধরে রাখতে পারে। রায়ের গদ্যের ছন্দটি মূলত শ্বাসের ছন্দের কাছাকাছি। বাক্য সাধারণত মাঝারি দৈর্ঘ্যের, অনুচ্ছেদ সাধারণত সংক্ষিপ্ত, ঘটনা ও ভাবনার মাঝে স্বাভাবিক বিরতি। এই ছন্দটি বাঙালি পাঠ-পরম্পরার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ; দীপেশ চক্রবর্তী তাঁর ‘প্রভিন্সিয়ালাইজিং ইউরোপ’ গ্রন্থে যে ‘বাঙালি আধুনিকতা’র কথা বলেছেন, সেই আধুনিকতার ভেতর এক ধরনের ধীর, ভাবুক পাঠ-অভ্যাস আছে; রায়ের গদ্য সেই অভ্যাসের সঙ্গে মানিয়ে চলে।
ক্যামেরার ছন্দটি ভিন্ন। ছবি সময়-ভিত্তিক মাধ্যম, এবং ছবি দেখার সময় দর্শকের নিজের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সীমিত। বই পড়ার সময় পাঠক যেকোনো জায়গায় থামতে পারেন, পেছনে ফিরে যেতে পারেন, একটি বাক্য দু’বার পড়তে পারেন; ছবি দেখার সময় সেটি সাধারণত হয় না (যদিও আজকের স্ট্রিমিং-পরিবেশে কিছুটা সম্ভব)। এই কারণে ছবিকে তার নিজের অভ্যন্তরীণ ছন্দে দর্শককে ধরে রাখতে হয়। যে ছবি খুব ধীর হয়, তা দর্শককে হারায়; যে ছবি খুব দ্রুত হয়, সেটি ভাবনার সুযোগ দেয় না।
সত্যজিৎ রায় তাঁর নিজের ছবিতে এই দু’টি ছন্দের ভেতর একটি ভারসাম্য তৈরি করতে পেরেছিলেন। তাঁর ছবিতে বাইরের ঘটনার গতি এবং ভেতরের ভাবনার গতি দু’টিরই জায়গা আছে। সোনার কেল্লার ট্রেন-যাত্রা দৃশ্যগুলির কথা ভাবুন; অথবা জয় বাবা ফেলুনাথে কুস্তির আখড়ায় মাছ্লীবাবার দৃশ্য। এই দৃশ্যগুলিতে কিছু ‘ঘটছে’ কিন্তু সেই ঘটাটি শ্বাসের ছন্দে ঘটছে, ক্যামেরা কাটের তাড়ায় ঘটছে না।
পরবর্তী পরিচালকেরা যখন এই ছন্দটি ধরার চেষ্টা করেন, তখন তাঁদের সামনে চাপ আসে দু’দিক থেকে - প্রথমত, সমকালীন ছবি-নির্মাণের পদ্ধতি; দ্বিতীয়ত, সমকালীন দর্শকের অভ্যাস। এই দু’টি চাপের সঙ্গে রফা করতে গিয়ে তাঁরা নিজেদের মতো ভারসাম্য খোঁজেন। সন্দীপ রায়ের ভারসাম্য একরকম, সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের আরেক রকম। কোনটি ‘সঠিক’ সেই প্রশ্নের কোনও সরল উত্তর নেই; প্রতিটি রফাই তার নিজস্ব শক্তি ও দুর্বলতা নিয়ে আসে।
জটায়ুর কৌতুক: পাতা থেকে পর্দায়
লালমোহন গাঙ্গুলির চরিত্রটি ফেলুদার বিশ্বে এক ধরনের কৌতুকময় ভারসাম্য আনে। তাঁর ভাষাগত ভুল, তাঁর তথ্যগত ভ্রান্তি, তাঁর অতিরঞ্জিত কল্পনা, এবং তাঁর ভেতরের আন্তরিকতা - এই সব মিলিয়ে একটি অসাধারণ চরিত্র। কিন্তু এই কৌতুকটিকে পর্দায় তোলা একটি বিশেষ চ্যালেঞ্জ। কারণ গদ্যে কৌতুকের অনেকটাই ভাষার ভেতরে - তাঁর ব্যবহৃত শব্দ, তাঁর বাক্যগঠনের ভঙ্গি, তাঁর তথ্যগত ভুল বলার ছন্দ। পর্দায় এই ভাষাগত কৌতুকের অনেকটাই অভিনেতার গলার ভঙ্গি ও মুখের অভিব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়।
সন্তোষ দত্ত যে কাজটি করেছিলেন - বিশেষত সোনার কেল্লা ও জয় বাবা ফেলুনাথে - সেটি বাংলা ছবির ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় কৌতুক-অভিনয়। তাঁর জটায়ুতে একটি ভেতরের সারল্য ছিল যা পাঠকের কল্পনার জটায়ুর সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। তাঁর মুখের অভিব্যক্তি, তাঁর কথা বলার সময়ের ছোট ছোট বিরতি, তাঁর চোখে যে স্বপ্নাতুর ভাব - এই সবই তাঁকে একটি দ্বিমাত্রিক কৌতুক-চরিত্র থেকে এক ত্রিমাত্রিক মানুষে রূপান্তরিত করেছিল।
বিভু ভট্টাচার্য পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই চরিত্রটি বহন করে এনেছিলেন। তাঁর অভিনয়শৈলী সন্তোষ দত্তের চেয়ে আলাদা ছিল - তিনি কিছুটা বেশি চটপটে, কিছুটা বেশি বহিরাগত। কিন্তু তিনিও জটায়ুর সেই কেন্দ্রীয় সারল্যটি ধরে রাখতে পেরেছিলেন।
সাম্প্রতিক ছবিগুলিতে এই চরিত্র যাঁরা করেছেন, তাঁদের সামনেও এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ - কৌতুকের ছন্দ ধরা, এবং চরিত্রের ভেতরের আন্তরিকতা ধরা। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি দেখানো গেলে চরিত্রটি ভেঙে পড়ে; দু’টিকে একসঙ্গে ধরা যে কোনও অভিনেতার পক্ষেই কঠিন কাজ।
জটায়ুর কৌতুকের আরেকটি দিক যা পর্দায় আনা কঠিন তা হল তাঁর লেখক-পরিচয়। উপন্যাসে আমরা মাঝে মাঝে তাঁর লেখা গোয়েন্দা-উপন্যাসের অংশ পড়ি, যেগুলি অসাধারণ কৌতুকের উৎস। ছবিতে এই অংশগুলি সাধারণত দেখানো যায় না; বড়জোর কেউ একটি বইয়ের প্রচ্ছদ ধরে দেখান, বা সংলাপে উল্লেখ করেন। কিন্তু গদ্যে এই ‘লেখক জটায়ু’র চরিত্রটি একটি স্বতন্ত্র মাত্রা; ছবি সেই মাত্রাটিকে প্রায়ই হারিয়ে ফেলে।
স্থানের চরিত্র: ভ্রমণ-গোয়েন্দা ও তার ছবি-রূপ
ফেলুদার রহস্যগুলির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল ভ্রমণ। প্রায় প্রতিটি গল্পে তাঁরা কোথাও যান - রাজস্থানে, বেনারসে, কাঠমাণ্ডুতে, লখনউয়ে, সিমলায়, পুরীতে, লন্ডনে, হংকংয়ে। এই ভ্রমণ শুধু পটভূমির বদল নয়, এটি গল্পের কাঠামোরই অংশ। বাঙালি পরিবারের মধ্যবিত্ত বাস্তবতায় পুজোর ছুটিতে বা গ্রীষ্মের ছুটিতে যেভাবে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা হয়, রায় সেই বাস্তবতাকেই গোয়েন্দা-অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গে মিশিয়েছেন।
এই ভ্রমণ-উপাদানটি ছবিতে আনার ক্ষেত্রে দু’টি চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, লোকেশন-শুটিংয়ের ব্যবহারিক চাপ। বাংলা ছবির বাজেট-পরিধি পশ্চিমা গোয়েন্দা-ছবির চেয়ে অনেক ছোট; বিদেশে বা দূর-দূরান্তে শুটিং করতে গেলে প্রযোজনায় চাপ পড়ে। দ্বিতীয়ত, ভ্রমণ-অভিজ্ঞতাকে ছবিতে এমনভাবে ধরা যাতে সেটি ট্রাভেলগ হয়ে না যায়, কিন্তু আবার সেটি স্থানের প্রকৃতিও যেন তুলে ধরে।
সত্যজিৎ রায় সোনার কেল্লায় রাজস্থানের যে চিত্র এঁকেছিলেন, সেটি একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি মরুভূমিকে দেখান, কিন্তু মরুভূমি সম্পর্কে কোনও ‘তথ্য’ দেন না। তিনি জয়সলমেরের কেল্লা দেখান, কিন্তু সেই কেল্লার ইতিহাস সম্পর্কে দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেন না। তাঁর ক্যামেরা স্থানকে তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলতে দেয়। এই সংযম অন্যান্য পরিচালকেরা সবসময় ধরে রাখতে পারেন না; কারণ ছবি বানানোর সময় ‘এই বিষয়টি দর্শককে বুঝিয়ে দেওয়া উচিত’ এই চাপটি অভিনেতা ও পরিচালকের মাথায় কাজ করে।
স্থানের প্রসঙ্গে আরেকটি জিনিস বলা দরকার। ফেলুদার গল্পগুলিতে যে সব স্থান আসে, সেগুলির ভেতর অনেকগুলিই আজ আর সেই অর্থে অস্তিত্বশীল নয়। লখনউ যা ছিল ১৯৭০-এর দশকে, সেটি আর নেই। বেনারসের ঘাটগুলি বদলে গেছে। কলকাতা স্বয়ং বদলে গেছে। ছবি যখন গল্পগুলিকে পর্দায় আনে, তখন তাকে স্থানের এই কালিক-পরিবর্তনের সঙ্গে রফা করতে হয়। হয় ছবি গল্পগুলিকে আজকের স্থানের ভেতর সেট করে, যা গল্পের আদি কালিক-পরিবেশকে বদলে দেয়; অথবা ছবি অতীতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করে, যা প্রযোজনাগতভাবে কঠিন। এই দু’টি পথের মাঝে ছবি-নির্মাতাদের রফা করতে হয়।
আপনি যদি ফেলুদার বিভিন্ন গল্প এবং তাদের পটভূমি সম্পর্কে আরও জানতে চান, তবে রিপোর্টমেডিকের ফেলুদা স্টোরি ফাইন্ডার (https://reportmedic.org/tools/feluda-story-finder.html) একটি কাজে লাগার মতো সরঞ্জাম। সেখানে আপনি স্থান, চরিত্র, প্রকাশকাল এবং অন্যান্য মাপকাঠি অনুযায়ী রায়ের লেখা গল্পগুলি খুঁজে নিতে পারেন। ভ্রমণ-পরিচয় ধরে গল্পগুলি সাজিয়ে দেখলে বোঝা যায় বাঙালি মধ্যবিত্তের ভ্রমণ-কল্পনার সঙ্গে রায় কীভাবে গোয়েন্দা-সাহিত্যকে মিশিয়েছিলেন।
তুলনামূলক চলচ্চিত্রায়ন: শারলক, প্যোয়ারো এবং অন্যরা
ফেলুদার চলচ্চিত্রায়নকে আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে হলে আমাদের অন্যান্য সাহিত্যিক গোয়েন্দার চলচ্চিত্রায়নের ইতিহাসের দিকেও তাকাতে হয়। শারলক হোমসকে নিয়ে এ পর্যন্ত যত ছবি ও টেলিভিশন-সিরিজ তৈরি হয়েছে, তা গণনার বাইরে। রবার্ট ডাউনি জুনিয়রের গাই রিচি-পরিচালিত ছবি, বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচের বিবিসি-সিরিজ, জনি লি মিলারের ‘এলিমেন্টারি’ - এই প্রতিটি কাজ ডয়েলের লেখা চরিত্রকে এক ভিন্ন দৃষ্টিকোণ দিয়ে পুনর্ব্যাখ্যা করে। কাম্বারব্যাচের হোমস আধুনিক লন্ডনে; মিলারের হোমস নিউ ইয়র্কে, একজন মহিলা ওয়াটসনের সঙ্গে; ডাউনির হোমস ভিক্টোরিয়ান যুগেই, কিন্তু অ্যাকশন-ছবির ভঙ্গিতে।
এই বহুমুখী পুনর্ব্যাখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ দেয়: একটি সাহিত্যিক চরিত্র ততক্ষণই জীবন্ত যতক্ষণ পরবর্তী প্রজন্ম তাকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ পায়। ফেলুদার ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। নতুন প্রজন্মের ছবি-নির্মাতারা যখন রায়ের চরিত্রকে নতুনভাবে দেখার চেষ্টা করেন, তখন সেটিকে ‘মূলের প্রতি অবিশ্বস্ততা’ হিসেবে দেখা একটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হবে। বরং প্রতিটি নতুন পুনর্ব্যাখ্যা চরিত্রটির জীবন্ততার প্রমাণ।
এরকুল প্যোয়ারোর চলচ্চিত্রায়ন আরেকটি শিক্ষণীয় উদাহরণ। ডেভিড সুশের যে দীর্ঘ টেলিভিশন-ইনিংস আগাথা ক্রিস্টির এই চরিত্রকে নিয়ে চলেছে, সেটি প্রায় সব কয়টি প্যোয়ারো-গল্পকে পর্দায় এনেছে। সুশে নিজে ক্রিস্টির লেখা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়ে, প্রতিটি ছোট বিবরণ ধরে চরিত্রটি গড়েছেন। তাঁর কাজের সাফল্য সব্যসাচী চক্রবর্তীর কাজের সঙ্গে কিছুটা তুলনীয় - দু’জনেই তাঁদের চরিত্রকে এমনভাবে বহন করেছেন যে দর্শকের মনে চরিত্রটির সঙ্গে তাঁদের মুখ অবিচ্ছেদ্যভাবে জুড়ে গেছে। কিন্তু একই সঙ্গে, সাম্প্রতিক কেনেথ ব্রানার পরিচালিত ও অভিনীত প্যোয়ারো-ছবিগুলি দেখায় যে একই চরিত্রকে অন্যভাবে দেখারও জায়গা থাকে।
পাস্কাল কাসানোভা তাঁর ‘দ্য ওয়ার্ল্ড রিপাবলিক অফ লেটার্স’ গ্রন্থে যে কথাটি বলেছেন বিশ্ব-সাহিত্যের পরিভ্রমণ সম্পর্কে, সেটি চলচ্চিত্রায়নের ক্ষেত্রেও খাটে। একটি সাহিত্যকর্ম যখন ভিন্ন মাধ্যম, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন প্রজন্মের ভেতর দিয়ে যায়, তখন প্রতিটি যাত্রায় সে কিছু হারায় এবং কিছু পায়। এই হারানো ও পাওয়া একটি অনিবার্য প্রক্রিয়া; এটিকে দুঃখ করার বিষয় না দেখে চর্চার বিষয় দেখা ভালো।
বাঙালি গোয়েন্দা-ঐতিহ্যের ভেতরে ব্যোমকেশের চলচ্চিত্রায়নও এই তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্জন দত্ত, দিবাকর ব্যানার্জী, অরিন্দম শীল - এঁরা প্রত্যেকে শরদিন্দুর চরিত্রকে ভিন্ন ভিন্নভাবে পর্দায় এনেছেন। সুশান্ত সিং রাজপুতের ব্যোমকেশ থেকে আবীর চট্টোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ থেকে যিশু সেনগুপ্তের ব্যোমকেশ - এই ভিন্ন রূপগুলি বাংলা গোয়েন্দা-সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়নে পরীক্ষা-নিরীক্ষার একটি সমৃদ্ধ পরিসর তৈরি করেছে। ফেলুদার চলচ্চিত্রায়ন এই বৃহত্তর পরিসরের একটি অংশ; এবং একে আলাদা করে দেখার চেয়ে এই পরিসরের ভেতর রেখে দেখলে বেশি কিছু বোঝা যায়।
ভেতরের কণ্ঠস্বর এবং তার পর্দা-প্রতিরূপ
আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে ফেলুদা-উপন্যাসগুলি প্রায় সবই তোপসের প্রথম-পুরুষ জবানিতে। এই জবানিভঙ্গিটি আরও একটু গভীরে গিয়ে দেখা প্রয়োজন কারণ এটি গদ্য থেকে চলচ্চিত্রে অনুবাদের সবচেয়ে কঠিন উপাদানগুলির একটি।
তোপসের কণ্ঠস্বর একটি বিশেষ ধরনের কৈশোর-কণ্ঠস্বর। সে তরুণ, কিন্তু বোকা নয়; সে সেজদাকে সম্মান করে, কিন্তু অন্ধ ভক্তি দিয়ে নয়; সে কৌতূহলী, কিন্তু তার কৌতূহল কখনও কখনও ফেলুদার ব্যাখ্যা পেতে অপেক্ষা করে। এই সূক্ষ্ম কৈশোর-চরিত্রটি বিশ্ব-সাহিত্যের কিশোর-জবানির ঐতিহ্যের সঙ্গে একটি সংলাপ চালায়। মার্ক টোয়েনের হাকলবেরি ফিন থেকে শুরু করে হার্পার লির স্কাউট ফিঞ্চ পর্যন্ত, কিশোর-জবানি একটি বিশেষ সাহিত্যিক যন্ত্র; এবং তোপসের জবানি সেই যন্ত্রের একটি বাংলা সংস্করণ।
এই জবানিকে পর্দায় আনার চেষ্টায় কী হয়? প্রথম বিকল্প হল ভয়েসওভার - যেখানে তোপসের কণ্ঠ পর্দার বাইরে থেকে কথা বলে, ছবির ফ্রেমকে তার মন্তব্যে ঢেকে রাখে। এই পদ্ধতিটি কাজ করতে পারে যদি ভয়েসওভারটি সংযত থাকে, কিন্তু অতিরিক্ত হলে ছবিটি বইয়ের অডিও-সংস্করণের মতো লাগতে শুরু করে।
দ্বিতীয় বিকল্প হল সংলাপের মধ্য দিয়ে তোপসের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করা। এই পদ্ধতিতে তোপসে ছবিতে ফেলুদাকে যে প্রশ্নগুলি করে, যে মন্তব্যগুলি করে, সেগুলির মধ্য দিয়েই তার চরিত্র গড়ে ওঠে। সত্যজিৎ রায় এই পদ্ধতিটিই ব্যবহার করেছেন। সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায়ের তোপসে যখন প্রশ্ন করে, যখন বিস্ময় প্রকাশ করে, যখন কোনও সিদ্ধান্ত মেনে নেয় বা না মেনে নেয় - এই সব মুহূর্তে আমরা তোপসের চরিত্রকে চিনতে পারি।
কিন্তু সংলাপের সীমাবদ্ধতা হল ছবিতে কতটা সংলাপ দেওয়া যায় তার একটি বাস্তব সীমা থাকে। অতিরিক্ত সংলাপ ছবিকে শ্বাসরুদ্ধকর করে তোলে। তোপসের যে অভ্যন্তরীণ চিন্তা-প্রবাহ গদ্যে দেখানো যায়, ছবিতে তার একটি ভগ্নাংশই দেখানো সম্ভব। এই হারানো অংশটি ছবির ‘খরচ’ - এটি অপরিহার্য, এবং একে স্বীকার করে ছবি তৈরি করতে হয়।
তৃতীয় বিকল্প, যা সাম্প্রতিক ছবিতে কখনও কখনও দেখা যায়, তা হল ফ্ল্যাশব্যাক ও দৃশ্যান্তরের ব্যবহার। এই পদ্ধতিতে কাহিনির ভেতরের সময়কে ভেঙে চরিত্রের চিন্তা-প্রবাহকে দৃশ্যত প্রকাশ করার চেষ্টা করা হয়। এই পদ্ধতি কখনও কাজ করে, কখনও করে না। সাধারণত, যত পরিচালক চরিত্রের চিন্তাকে দৃশ্যত দেখানোর চেষ্টায় কৌশল-সংখ্যা বাড়ান, তত ছবিটি কৃত্রিম শোনায়।
রায়ের গদ্যের দার্শনিকতা এবং তা পর্দায়
ফেলুদার রহস্যগুলিতে শুধু রহস্য-সমাধান নেই, একটি দার্শনিক উপাদানও আছে। এই উপাদানটি প্রায়ই সরাসরি সংলাপের মধ্য দিয়ে আসে না, বরং পরিস্থিতি ও চরিত্রের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে আসে। ফেলুদা যখন একটি প্রতারককে ধরেন, যখন তিনি একটি প্রাচীন মূর্তি ফেরত দেন, যখন তিনি একটি পরিবারের ভেতরের ক্ষতকে নিরাময় করেন - এই প্রতিটি কাজে একটি নৈতিক অবস্থান কাজ করছে। এই অবস্থানটি প্রায়ই শব্দে ব্যাখ্যা করা হয় না, কেবল ক্রিয়ায় প্রকাশ পায়।
দীপেশ চক্রবর্তী যেভাবে বাঙালি আধুনিকতার ভেতর একটি বিশেষ নৈতিক-সাংস্কৃতিক স্বরের কথা বলেছেন, সেই স্বরটি ফেলুদার চরিত্রে আছে। তিনি একজন আধুনিক বুদ্ধিজীবী, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি একটি ঐতিহ্যের ভেতরে দাঁড়িয়ে; তিনি যুক্তিবাদী, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি কিছু কিছু অযুক্তিকেও সম্মান করেন; তিনি বিদেশি গোয়েন্দা-সাহিত্য পড়েছেন, কিন্তু তাঁর চিন্তা-পদ্ধতি বিদেশি অনুকরণ নয়। এই জটিল অবস্থানটি ছবিতে আনা কঠিন, কারণ ছবি স্বাভাবিকভাবেই চরিত্রকে সরলীকরণ করে তোলে।
এই দার্শনিক স্তরটি পর্দায় কতটা আসে তা নির্ভর করে পরিচালক ও অভিনেতা কতটা সংযম রাখতে পারেন তার ওপর। সত্যজিৎ রায়ের নিজের ছবিতে এই সংযম স্বাভাবিকভাবেই ছিল, কারণ লেখক ও পরিচালক একই মানুষ। পরবর্তী পরিচালকেরা যখন সেই সংযম ধরার চেষ্টা করেন, তখন তাঁদের সেটি সচেতন প্রচেষ্টায় ধরতে হয়। কখনও সফল হন, কখনও হন না। কিন্তু চেষ্টাটিই গুরুত্বপূর্ণ।
ভাষাগত নির্দিষ্টতা এবং অনুবাদের অসম্ভাবনা
ফেলুদা একটি বাংলা চরিত্র, এবং তাঁর চারপাশের পৃথিবীটি একটি বাংলা পৃথিবী। এই বাংলা-নির্দিষ্টতাটি ভাষার ভেতরে গাঁথা। যখন ফেলুদা বলেন ‘মগজাস্ত্র’, যখন তিনি জটায়ুর কোনও ভুল উচ্চারণ ধরিয়ে দেন, যখন তোপসের কথায় বাংলা প্রবাদ বা বাগধারা আসে - এই সব মুহূর্তে এমন একটি ভাষাগত সংস্কৃতি কাজ করে যা অনুবাদে হারিয়ে যায়।
লরেন্স ভেনুটি তাঁর ‘দ্য ট্রান্সলেটরস ইনভিজিবিলিটি’ গ্রন্থে যে কথাটি বলেছেন, সেটি এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখাচ্ছেন যে অনুবাদ কখনও নিরপেক্ষ নয়; প্রতিটি অনুবাদ একটি ব্যাখ্যা, এবং প্রতিটি ব্যাখ্যা মূলকে কিছুটা বদলে দেয়। চলচ্চিত্রায়নকেও আমরা এক ধরনের অনুবাদ হিসেবে দেখতে পারি - মাধ্যমের অনুবাদ। এই অনুবাদেও মূলের কিছু কিছু উপাদান টিকে থাকে, কিছু বদলে যায়, কিছু হারিয়ে যায়।
বাংলা ভাষার কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা চলচ্চিত্রায়নে আনা বিশেষভাবে কঠিন। প্রথমত, বাংলায় সম্মান-সূচক সর্বনাম ব্যবহারের যে সূক্ষ্মতা - ‘তুমি’, ‘তুই’, ‘আপনি’ - এই তিনটি স্তরের ভেতরের সামাজিক সম্পর্কের বৈচিত্র্য। ছবিতে এই সর্বনামগুলি কান দিয়ে শোনা যায় বটে, কিন্তু একজন অ-বাংলাভাষী দর্শক এই সূক্ষ্মতা ধরতে পারেন না; এমনকি বাংলাভাষী দর্শকও সংলাপের গতিতে এই সূক্ষ্মতা সবসময় সচেতনভাবে নিবন্ধন করেন না। গদ্যে এই সর্বনাম-পরিবর্তন অনেক সময় চরিত্রের সম্পর্কের একটি চাবিকাঠি; ছবিতে সেটি প্রায়ই গৌণ হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, বাংলায় শ্রেণি-চিহ্নিত উচ্চারণের যে বৈচিত্র্য আছে - কলকাতার মধ্যবিত্ত শহুরে উচ্চারণ, পূর্ববঙ্গীয় উচ্চারণ, পশ্চিমবঙ্গীয় গ্রামীণ উচ্চারণ, বিভিন্ন পেশাগত উচ্চারণ - এই সবকিছু ছবিতে আনা যায়, এবং রায় তাঁর ছবিতে এনেছেনও। কিন্তু গদ্যে এই উচ্চারণ-বৈচিত্র্য একভাবে প্রকাশ পায়, ছবিতে অন্যভাবে। জটায়ুর কথ্য উচ্চারণ সাহিত্যে যেভাবে লেখা হয় এবং ছবিতে যেভাবে শোনা যায়, সেই দুইয়ের মধ্যে একটি পার্থক্য আছে যা মাধ্যমের প্রকৃতি থেকে আসে।
তৃতীয়ত, বাংলা সাহিত্যের একটি অভ্যন্তরীণ পাঠ-ঐতিহ্য আছে যা পাঠকের পূর্বজ্ঞানের উপর নির্ভর করে। যখন রায় কোনও বাংলা সাহিত্যিকের নাম উল্লেখ করেন, কোনও পুরনো গানের লাইন উদ্ধৃত করেন, কোনও ঐতিহাসিক ঘটনার ইঙ্গিত দেন - তখন বাংলা পাঠক সেই সব ইঙ্গিতগুলি ধরতে পারেন। ছবিতে এই ইঙ্গিতগুলি আনা যায়, কিন্তু সেগুলি আনলে দর্শকের পূর্বজ্ঞানের উপর নির্ভর করতে হয়। যে দর্শক বাংলা সাহিত্য-ঐতিহ্যের ভেতর বড় হননি, তাঁর কাছে এই ইঙ্গিতগুলি অর্থহীন।
সংগীত, শব্দ-ব্যবস্থাপনা এবং চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষা
এতক্ষণ আমরা মূলত আলোচনা করেছি ছবি গদ্য থেকে কী পায় আর কী হারায়। কিন্তু ছবির নিজস্ব কিছু সম্পদ আছে যা গদ্যে নেই। সংগীত এই সম্পদগুলির মধ্যে অন্যতম।
সত্যজিৎ রায়ের নিজের সংগীত সোনার কেল্লা ও জয় বাবা ফেলুনাথে যেভাবে কাজ করে, সেটি বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। তিনি একজন প্রশিক্ষিত সংগীত-চিন্তক ছিলেন, এবং তাঁর ছবির সংগীতে তিনি সেই চিন্তার গভীরতা ঢেলে দিতেন। সোনার কেল্লার মূল থিম-সংগীতটি, যা মরুভূমির প্রসারতা ও ফেলুদার ব্যক্তিত্বের গাম্ভীর্য দু’টিকেই ধারণ করে, বাংলা চলচ্চিত্র-সংগীতের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় রচনা। গদ্য এমন কিছু করতে পারে না - সংগীতের মাধ্যম ভিন্ন।
সংগীতের পাশাপাশি শব্দ-ব্যবস্থাপনা বা সাউন্ড ডিজাইনও ছবির একটি বিশিষ্ট সম্পদ। জয় বাবা ফেলুনাথে বেনারসের ঘাটের শব্দ - জলের শব্দ, ঘণ্টার শব্দ, দূরে কীর্তনের শব্দ, আশেপাশের মানুষের কণ্ঠস্বর - এই সব মিলিয়ে যে ধ্বনি-পরিবেশ তৈরি হয়, সেটি ছবির ভেতর একটি বিশেষ স্থানিক বাস্তবতা গড়ে তোলে। গদ্যে এই সব শব্দ লিখে বর্ণনা করতে হয়; ছবিতে সেগুলি সরাসরি শ্রোতার কানে পৌঁছয়।
পরবর্তী পরিচালকেরা সংগীত ও শব্দ-ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী কাজ করেছেন। সন্দীপ রায়ের ছবিতে সংগীতের ব্যবহার পিতার ছবির তুলনায় কিছুটা ভিন্ন - কখনও কখনও সংগীত আবহকে আরও স্পষ্ট করে দেয়, কখনও কখনও আরও উপস্থিত হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক ছবিগুলিতে সংগীতের ব্যবহার আরও সমকালীন - ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর কখনও কখনও পশ্চিমা থ্রিলার-ছবির ছন্দ অনুসরণ করে। এই বৈচিত্র্যকে সমালোচনা করার চেয়ে বোঝার চেষ্টা করা ভালো; প্রতিটি প্রজন্ম তার নিজের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে কাজ করে।
দর্শক-প্রজন্ম এবং তাঁদের পরিবর্তিত প্রত্যাশা
ফেলুদার চলচ্চিত্রায়নের আলোচনা শেষ করার আগে আমাদের দর্শকদের কথা ভাবা প্রয়োজন। কারণ চলচ্চিত্র একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঘটনা; এটি কোনও বিচ্ছিন্ন শিল্পকর্ম নয়, এটি দর্শকের সঙ্গে সংলাপে বেঁচে থাকে। যাঁরা সত্তরের দশকে সোনার কেল্লা প্রথম দেখেছিলেন, তাঁদের প্রজন্মের সিনেমা-অভ্যাস এবং আজকের কিশোর দর্শকের সিনেমা-অভ্যাস এক নয়।
পুরনো প্রজন্মের দর্শক ছবিকে একটি ধৈর্যময় অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করতেন। তাঁরা সিনেমা হলে যেতেন, ছবি দেখতেন, এবং ছবিকে তার নিজের ছন্দে গড়ে উঠতে দিতেন। দীর্ঘ দৃশ্য, সংযত সংলাপ, ধ্যানময় বিরতি - এই সব তাঁদের কাছে স্বাভাবিক ছিল। আজকের তরুণ দর্শক, যাঁরা ইউটিউবের ছোট-ছোট ভিডিও, টিকটকের অতি-সংক্ষিপ্ত বিনোদন, ওটিটির দ্রুত-গতির সিরিজে অভ্যস্ত, তাঁদের ধৈর্য-পরিধি ভিন্ন। এই পরিবর্তনটি কোনও ‘দুর্বলতা’ নয়; এটি মাধ্যম-পরিবেশের পরিবর্তন।
এই পরিবর্তনের প্রতি ফেলুদা-ছবিগুলির সাড়া ভিন্ন ভিন্ন। কেউ কেউ পুরনো ছন্দে অটল থাকেন, কেউ কেউ নতুন ছন্দের সঙ্গে রফা করেন। কোন পথ ‘সঠিক’ সেই প্রশ্নের কোনও সরল উত্তর নেই। যে ছবি পুরনো ছন্দে থাকে, সেটি হয়তো কিছু পুরনো দর্শকের আনুগত্য পায়, কিন্তু নতুন প্রজন্মকে হারায়। যে ছবি নতুন ছন্দে যায়, সেটি নতুন দর্শক পায়, কিন্তু পুরনো দর্শকের মন ভাঙায়। এই দ্বিধা যে কোনও দীর্ঘস্থায়ী চরিত্রের চলচ্চিত্রায়নের সামনে আসে।
স্যান্ড্রা বেকেট তাঁর ‘ক্রসওভার ফিকশন’ গ্রন্থে যে কথাটি বলেছেন কিশোর-সাহিত্য থেকে যৌবনে উত্তরণের পাঠকের কথা ভেবে, সেটি ফেলুদার দর্শক সম্পর্কেও প্রযোজ্য। ফেলুদা এমন একটি চরিত্র যাঁকে কিশোর বয়সে পড়া যায় এবং পরবর্তীতেও বার বার ফিরে পড়া যায়। প্রতিটি পঠনে তিনি ভিন্নভাবে ধরা দেন। ছবিতেও এটি ঘটতে পারে, কিন্তু সেই ঘটনার জন্য ছবিকেও সেই বহুস্তরীয়তা ধারণ করতে হবে - একই সঙ্গে সরল এবং গভীর, একই সঙ্গে বিনোদন এবং চিন্তা-উদ্দীপক।
উপসংহার: পর্দা ও পাতার দ্বি-ছন্দে ফেলুদা
আমরা যখন পেছনে তাকাই এবং ফেলুদার চলচ্চিত্রায়নের বিস্তৃত পথটি দেখি, তখন একটি সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। কিছু কিছু ছবি গদ্যের আত্মা ধরে রাখতে পেরেছে, কিছু কিছু পারেনি; কিছু কিছু চরিত্রকে নতুনভাবে আলোকিত করেছে, কিছু কিছু সরলীকৃত করেছে। এই বৈচিত্র্যকে বিচার করার চেষ্টা করার চেয়ে বোঝার চেষ্টা করা ভালো।
সত্যজিৎ রায়ের নিজের দু’টি ছবি একটি বিশেষ মর্যাদা ভোগ করবে কারণ সেগুলি লেখকের নিজের চলচ্চিত্রায়ন। তবে এই মর্যাদাকে আমরা অন্যান্য ছবিগুলির বিরুদ্ধে একটি দণ্ড হিসেবে ব্যবহার করতে পারি না। সন্দীপ রায়ের কাজ, সব্যসাচীর দীর্ঘ ইনিংস, নতুন প্রজন্মের পরীক্ষা-নিরীক্ষা - এই সব মিলিয়ে যে চলচ্চিত্রায়ন-ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে, সেটি একটি জীবন্ত পরম্পরা। এই পরম্পরার ভেতর প্রতিটি ছবি একটি নতুন মুহূর্তে দাঁড়িয়ে রায়ের চরিত্রকে নতুনভাবে দেখতে চেয়েছে।
বাঙালি পাঠক ও দর্শকের কাছে ফেলুদা একটি দ্বৈত-অস্তিত্ব হিসেবে বেঁচে আছেন - পাতায় এবং পর্দায়। এই দ্বৈত-অস্তিত্ব আসলে চরিত্রটির সবচেয়ে বড় শক্তি। যাঁরা প্রথমে বই পড়েছেন, তাঁরা ছবিতে গিয়ে নিজেদের কল্পনার সঙ্গে পর্দার বাস্তবতাকে মেলান। যাঁরা প্রথমে ছবি দেখেছেন, তাঁরা পরে বই পড়তে গিয়ে গদ্যের সংযম ও গভীরতা আবিষ্কার করেন। এই দু’মুখী পথে ফেলুদা একটি সাহিত্য-চরিত্র এবং একটি চলচ্চিত্র-চরিত্র দু’য়েরই মাত্রা পেয়ে গেছেন।
ভবিষ্যতে আরও ছবি হবে, আরও অভিনেতা এই চরিত্র করবেন, আরও পরিচালক নিজেদের মতো করে রায়ের লেখা পুনর্ব্যাখ্যা করবেন। প্রতিটি নতুন কাজ পুরনো কাজের সঙ্গে একটি সংলাপে লিপ্ত হবে - কখনও সম্মতিতে, কখনও বিরোধে, কখনও পুনর্নির্মাণে। এই সংলাপটিই বাঙালি সংস্কৃতির ভেতর ফেলুদাকে জীবন্ত রাখবে। যতদিন এই সংলাপ চলবে, ততদিন প্রদোষচন্দ্র মিত্র শুধু একটি সাহিত্য-চরিত্র থাকবেন না, একটি সাংস্কৃতিক বাস্তবতাও থাকবেন।
সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘আওয়ার ফিল্মস, দেয়ার ফিল্মস’ গ্রন্থে ছবি ও সাহিত্যের সম্পর্ক সম্পর্কে যে কথাগুলি বলেছিলেন, সেগুলি আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি সাহিত্য থেকে ছবি বানানোকে কখনও সরল ‘অনুবাদ’ হিসেবে দেখতেন না; তিনি দেখতেন একটি মাধ্যম থেকে আরেকটি মাধ্যমে চিন্তার পুনর্জন্ম হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলে আমরা প্রতিটি ফেলুদা-ছবিকে তার নিজস্ব মূল্যে বিচার করতে পারব, পাতার সঙ্গে যান্ত্রিক তুলনা করে নয়।
ফেলুদা সম্পর্কে আরও পড়ার জন্য পাঠকেরা ইনসাইট ক্রাঞ্চের অন্যান্য বাংলা প্রবন্ধগুলি দেখতে পারেন - বিশেষত সব্যসাচী চক্রবর্তী বনাম টোটা রায়চৌধুরীর তুলনামূলক আলোচনা, ফেলুদার বেনারস-ভ্রমণ নিয়ে আলাদা প্রবন্ধ, এবং সত্যজিৎ রায়ের গদ্যশৈলী সম্পর্কিত বিশ্লেষণাত্মক রচনা। ইংরেজিতে যাঁরা পড়তে চান, তাঁদের জন্য এই প্রবন্ধটির ইংরেজি সহযোগী রচনা /2018/03/03/feluda-film-adaptation-analysis/ ঠিকানায় আছে। সেখানে একই বিষয়টি ভিন্ন ভাষাগত-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে আলোচিত হয়েছে।
ফেলুদার সমস্ত গল্প এক জায়গায় খুঁজে পেতে এবং কোন গল্পে কোন স্থান, কোন চরিত্র, কোন বছরের পটভূমি - এই সব মাপকাঠি অনুযায়ী খুঁজতে পাঠকেরা রিপোর্টমেডিকের ফেলুদা স্টোরি ফাইন্ডার (https://reportmedic.org/tools/feluda-story-finder.html) ব্যবহার করতে পারেন। চলচ্চিত্রায়িত গল্পগুলি এবং চলচ্চিত্রায়িত নয় এমন গল্পগুলির ভেতরে যে পার্থক্য, সেই পার্থক্য বুঝতেও এই সরঞ্জামটি কাজে লাগে। কারণ একটি চিন্তার বিষয় হল, রায়ের সব গল্পই কেন চলচ্চিত্রিত হয়নি, এবং কেন কিছু গল্প বার বার চলচ্চিত্রিত হয়েছে - এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা পাঠ ও পর্দার সম্পর্ক বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
শেষ পর্যন্ত, ফেলুদার চলচ্চিত্রায়নের ইতিহাস আমাদের দেখায় যে একটি জীবন্ত চরিত্র কীভাবে বিভিন্ন মাধ্যম, বিভিন্ন প্রজন্ম, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মুহূর্তের ভেতর দিয়ে যাত্রা করে। প্রতিটি যাত্রায় চরিত্রটি কিছু বদলায়, কিছু রাখে; কিছু পায়, কিছু হারায়। কিন্তু মূল চরিত্রটি - সেই বুদ্ধিদীপ্ত, সংযত, নৈতিকভাবে স্পষ্ট, সাংস্কৃতিকভাবে গভীর বাঙালি গোয়েন্দা - বার বার ফিরে আসেন। তিনি ফিরে আসেন কারণ বাঙালি পাঠক ও দর্শকের তাঁকে দরকার; এবং বাঙালি পাঠক ও দর্শকের তাঁকে দরকার কারণ তিনি একটি বিশেষ ধরনের আত্ম-প্রতিচ্ছবি ধরে রাখেন - একটি আদর্শ-আত্ম, যিনি যুক্তি ও সংস্কৃতি, আধুনিকতা ও ঐতিহ্য, কৌতূহল ও সংযম - এই সব দ্বন্দ্ব-জোড়াকে এক শরীরে ধারণ করেন।
পর্দা ও পাতার এই দ্বি-ছন্দে ফেলুদা বেঁচে থাকেন। এই দ্বি-ছন্দটিই তাঁর দীর্ঘ আয়ুর রহস্য।